সংবাদ ব্রিফিং

শিশুরদের বেশি ভারী ব্যাগ বহন নয় – আদালত






bags-main-gorai24
প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন নিষেধ করে সুনির্দিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। রায় পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে এই আইন করতে আইনসচিব, শিক্ষাসচিব, গণশিক্ষাসচিবসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই নির্দেশনাসহ রায় দেন।

আইন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাথমিকে যাওয়া শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন করা যাবে না বলে নতুন করে একটি সার্কুলার জারি করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে এই সার্কুলার জারি করতে বলা হয়েছে। এতে তদারকির জন্য সেল রাখা, ব্যর্থ হলে কী শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে, তা-ও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। আর তা না হলে এর দায়দায়িত্ব গণশিক্ষাসচিব ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বহন করতে হবে বলে রায়ে বলা হয়। এ বিষয়ে অভিভাবক, শিক্ষকসহ অংশীজনের সচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, প্রাথমিকের শিশুদের ব্যাগের ওজন কতটুকু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন অনুপস্থিত। তাই এ ধরনের আইন করা অপরিহার্য। শিশুদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশের দিকে লক্ষ্য রেখে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হলো।

রায়ে ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর ‘স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই ‘ভারী স্কুলব্যাগ বহন করতে পারবে না মহারাষ্ট্রের শিশুরা’ প্রকাশিত নিবন্ধের তথ্যও উদ্ধৃত করা হয়। ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, সুস্বাস্থ্য অর্থ সুন্দর জীবন। সুস্বাস্থ্য মানসিক ও সামাজিক বিকাশে ভূমিকা রাখে।

রায়ে বলা হয়, ভারী ব্যাগ বহনের কারণে কোমলমতি শিশুদের মেরুদণ্ডের হাড় বাঁকা হয়ে যায়। এতে শিশুর স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়। এতে শিশুরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। শিশুরা যদি এই ভারী ব্যাগ বহন করতে থাকে, তাহলে তারা কখনো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারবে না। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে না পারলে তারা সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে না। ফলে সমগ্র জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। বেশি ওজনের স্কুলব্যাগ বহনের কারণে প্রাথমিকে যাওয়া শিশুদের শরীরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

রায়ে আরও বলা হয়, ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর সরকার একটি সার্কুলার জারি করলেও তা কার্যকর দেখা যায় না। সার্কুলার তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও নেই। ২০১৬ সালেও এসে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা স্কুলের ভারী ব্যাগ বহন করছে। এ ব্যাগ বহনের বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের কোনো বিদ্যালয়ের নজরদারিও দেখা যাচ্ছে না। স্কুল কর্তৃপক্ষ সরকারের ওই পরিপত্র মেনে চলছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ জন্য ব্যবস্থাও নেয়নি, নীরব থেকেছে। ওই সার্কুলারটি পরিপূর্ণ ও যথেষ্ট নয়। নতুন করে সার্কুলার জারি করতে বলা হলো।

প্রাথমিকে শিশুদের ব্যাগ বহনে সুনির্দিষ্ট আইন, বিধিমালা ও নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে গত বছরের আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেছিলেন। তাঁরা হলেন মাসুদ হোসেন দোলন, মোহাম্মদ জিয়াউল হক ও আনোয়ারুল করিম।

প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ১১ আগস্ট হাইকোর্ট রুল দেন। রুলে প্রাথমিক স্কুলগামী শিশুদের শরীরে ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন নিষেধ করে আইন প্রণয়নের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মাসুদ হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। এই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল বুধবার হাইকোর্ট তা যথাযথ (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করে রায় দেন।

রিট আবেদনে বলা হয়েছিল, ভারী স্কুলব্যাগ বহন করে পিঠে ব্যথা, সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারার কষ্ট নিয়ে শিশুরা চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছে। তাদের প্রায় সবাই বলছে, স্কুলব্যাগের ওজন বেশি; বহন করতে কষ্ট হয়।

রাজধানীর উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরের এক শিক্ষার্থীর বাবা শরিফুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি উচ্চ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এটা একটা ইতিবাচক ঘটনা। এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, শিশুদের ওপর যে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের ধারণক্ষমতার বাইরে। একজন বাবা হিসেবে বলব, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির একটি শিশুকে কেন তিনটি ইংরেজি বই পড়তে হবে? এতে তো তার স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়।’ তিনি বলেন, তাঁরা আশা করছেন, এই রায় পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে এবং যাতে এত বেশি বই আর পড়তে না হয়, সেই বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উচ্চ আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম। তিনি বলেন, শুধু বিদ্যালয়ের কারণেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কারণেও শিশুদের ব্যাগের ওজন ভারী হয়। এ জন্য বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি।